
Written by
Published at
November 29, 2025
কখন সিজার করাতে হয়?
সিজার করানোর প্রয়োজন হয় যখন স্বাভাবিক প্রসব ঝুঁকিপূর্ণ হয়, যেমন শিশুর অবস্থান ঠিক না থাকলে, মায়ের শারীরিক অসুস্থতা থাকলে, বা যমজ/তিন সন্তান থাকলে। এছাড়া, গর্ভাবস্থার ৩৮-৩৯ সপ্তাহের আগে সিজার করা উচিত নয় যদি না কোনো জরুরি কারণ থাকে। এছাড়া, যদি স্বাভাবিক প্রসবের সময় কোনো জটিলতা দেখা দেয়, তাহলেও সিজারের প্রয়োজন হতে পারে। অন্যদিকে গর্ভকালীন ও প্রসব সংক্রান্ত কিছু বিশেষ জটিলতার ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে সিজারের মাধ্যমে শিশুর ডেলিভারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
পরিকল্পিত সিজার অপারেশন
নিচের ক্ষেত্রগুলোতে প্রসববেদনা ওঠার আগে থেকেই সিজারের মাধ্যমে ডেলিভারির পরিকল্পনা করে রাখা হয়—
প্লাসেন্টা প্রিভিয়া
প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল সাধারণত জরায়ুর ওপরের অংশে থাকে। যদি কোনো কারণে প্লাসেন্টা জরায়ুর নিচের দিকে থাকে, তাহলে ডাক্তারি ভাষায় তাকে ‘প্লাসেন্টা প্রিভিয়া’ বলে। আপনার এই জটিলতা থাকলে সাধারণত আলট্রাসানোগ্রাম করানোর সময়ে এটি ধরা পড়বে।
প্লাসেন্টা প্রিভিয়া হলে শিশুর নরমাল ডেলিভারির পথে বাধা সৃষ্টি হয়। এমন অবস্থায় নরমাল ডেলিভারির চেষ্টা করা হলে মায়ের ভারী রক্তপাত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়—যা মা ও গর্ভের শিশু উভয়ের জন্যই খুব ঝুঁকিপূর্ণ।
ব্রীচ অথবা অস্বাভাবিক অবস্থান
প্রসবের জন্য গর্ভের শিশুর আদর্শ অবস্থান হয় এমন—মাথা নিচে ও নিতম্ব ওপরে থাকে, আপনার পিঠের দিকে মুখ করে থাকে এবং ঘাড় এমনভাবে ভাঁজ করা থাকে যেন চিবুক বা থুতনি বুকে লেগে থাকে। তবে শিশুর নিতম্ব কিংবা পা নিচে ও মাথা ওপরে থাকলে সেই অবস্থানকে ডাক্তারি ভাষায় ‘ব্রীচ’ বলা হয়।
শিশু ‘ব্রীচ’ অবস্থানে থাকলে ডেলিভারির জন্য সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হয়ে দাঁড়ায় সিজারিয়ান অপারেশন। এ ছাড়া গর্ভে শিশুর মাথা নিচে থাকার পরিবর্তে শিশু যদি আড়াআড়িভাবে থাকে, তাহলে কেবলমাত্র সিজারের মাধ্যমেই নিরাপদে ডেলিভারি করানো যায়।
যমজ শিশু
যদি আপনার গর্ভে একাধিক সন্তান থাকে, তাহলে সিজার করানোর প্রয়োজন হতে পারে। এমন হলে যে সবক্ষেত্রেই সিজার করাতে হবে, তা নয়। অনেকসময় নরমাল ডেলিভারিও সম্ভব।তবে যদি গর্ভে দুটি যমজ শিশু থাকে এবং প্রসবের রাস্তায় এগিয়ে থাকা শিশুটির মাথা নিচের দিকে না থাকে, তাহলে সিজারিয়ান
পদ্ধতি বেছে নিতে হতে পারে। সেই সাথে গর্ভে যত বেশি সন্তান থাকে, সিজারের মাধ্যমে ডেলিভারির সম্ভাবনাও তত বেড়ে যায়।
প্রসবের রাস্তা ও শিশুর আকার
যদি গর্ভের শিশুর আকার আপনার প্রসবের রাস্তার তুলনায় যথেষ্ট চওড়া না হয়, তাহলে নিরাপদে নরমাল ডেলিভারি করানো সম্ভব হয় না। তুলনামূলকভাবে ছোটো প্রসবের রাস্তা ও যোনিপথ দিয়ে বড় আকারের শিশু প্রসব করা খুবই কষ্টসাধ্য বা অসম্ভব হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে সিজার করানোর পরিকল্পনা করা হয়।
স্বাস্থ্য সমস্যা
যদি আপনার নির্দিষ্ট কিছু রোগ থাকে এবং নরমাল ডেলিভারির তুলনায় সিজার করলে তা আপনার ও গর্ভের শিশুর জন্য বেশি নিরাপদ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে সিজারের মাধ্যমে ডেলিভারির পরিকল্পনা করে রাখা হবে। এমন রোগের মধ্যে রয়েছে অতি উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের নির্দিষ্ট কিছু রোগ এবং ব্রেইনের নির্দিষ্ট জটিলতা।
ইনফেকশনের সম্ভাবনা
আপনার যদি এমন কোনো ইনফেকশন হয়ে থাকে যা যোনিপথ দিয়ে প্রসবের সময়ে শিশুর মধ্যে ছড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে সিজারের মাধ্যমে শিশুর ডেলিভারি করানো হতে পারে। যেমন: এইচআইভি ইনফেকশন ও যৌনাঙ্গের হার্পিস।
প্রসবকালীন জটিলতা:
নাভিরজ্জু (Umbilical Cord) প্রসব পথে চলে এলে: এটি একটি জরুরি অবস্থা, যেখানে নাড়িতে চাপ পড়ে শিশুর রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে।
মায়ের স্বাস্থ্যের কারণে:
৩. শিশুর স্বাস্থ্য বা পরিস্থিতি:
সিজার করার সিদ্ধান্ত একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক মা ও শিশুর সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে নিয়ে থাকেন।
সিজারিয়ান অপারেশনের ঝুঁকি
সাধারণত সিজারিয়ান অপারেশন খুবই নিরাপদ একটি অপারেশন। তবে অন্য সব বড় অপারেশনের মতো এখানেও কিছু ঝুঁকি রয়েছে। ঝুঁকির মাত্রা নির্ভর করে আপনার শারীরিক অবস্থা ও সিজারের ধরনের ওপর। সাধারণত অল্প সংখ্যক অপারেশনের ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয়। চিকিৎসার মাধ্যমে সাধারণত এসব সমস্যার সমাধানও করে ফেলা যায়। তবে বিরল কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে। এমনকি মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
প্রসূতির ঝুঁকি
জরায়ু, এর আশেপাশের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও কাটা স্থানের ইনফেকশন: এক্ষেত্রে জ্বর, পেট ব্যথা, যোনিপথে অস্বাভাবিক স্রাব ও ভারী রক্তপাত, কাটা স্থান ফুলে লাল হয়ে যাওয়া ও পুঁজ বের হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। এসব সমস্যা বেশ কমন। তবে সঠিকভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ঔষধ ব্যবহারের মাধ্যমে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ: ভারী রক্তক্ষরণ হলে আপনাকে কখনো কখনো রক্তদান করা হতে পারে। বিরল কিছু ক্ষেত্রে আবার অপারেশন করে রক্তপাত বন্ধ করতে হতে পারে। এমনকি রক্তক্ষরণ বন্ধ করা সম্ভব না হলে জরায়ু কেটে ফেলে দিতে হতে পারে।
রক্ত জমাট বাঁধা: পায়ের রক্তনালীতে রক্ত জমাট বেঁধে একটা চাকা তৈরি হতে পারে। এটা থেকে পায়ে ব্যথা হয়ে পা ফুলে যেতে পারে। জমাট বাঁধা রক্ত নালী থেকে ছিটকে ফুসফুসে গিয়ে আটকে যেতে পারে—যা থেকে প্রাণঘাতী শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
মূত্রথলি, মূত্রনালী ও জরায়ুর আশেপাশের অঙ্গে আঘাত: অপারেশনের সময়ে মূত্রনালী অথবা নাড়িভুঁড়িতে আঘাত লাগতে পারে। এ থেকে গুরুতর জটিলতা তৈরি হয়ে আরেকটি অপারেশন করার প্রয়োজন হতে পারে।
স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরতে দেরি হওয়া: সিজার করলে নরমাল ডেলিভারির তুলনায় স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরতে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় লাগে। এজন্য শারীরিক, মানসিক ও পারিবারিক জীবন ব্যহত হতে পারে।
সাধারণত সিজারিয়ান অপারেশনের পর পরবর্তী গর্ভাবস্থা অথবা জন্মদানের বেলায় নারীদের তেমন সমস্যা হয় না। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে সিজারের পর আবার গর্ভধারণ করলে গর্ভাবস্থা ও প্রসব সংক্রান্ত ঝুঁকি বেড়ে যায়।যেমন—
এসব জটিলতার কথা মাথায় রেখে সাধারণত যেসব ক্ষেত্রে সিজার না করালেই নয়, অর্থাৎ অপারেশনের ঝুঁকির তুলনায় উপকারিতা বেশি দেখা যায়, সেসব ক্ষেত্রেই সিজার করানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পরামর্শ: গর্ভাবস্থায় আপনার ডেলিভারির পদ্ধতি কী হবে, তা নিয়ে অবশ্যই আপনার ডাক্তারের সাথে আলোচনা করে পরিকল্পনা তৈরি করে রাখা উচিত।