

Written by
Md Shahnewaj Imran
Verified by
Dr Neshat Sultana
Published at
January 24, 2025
গর্ভে বেশিরভাগ শিশুই ডেলিভারির আগে মাথা নীচের দিকে এবং পা ওপরের দিকে দিয়ে রাখে। এই অবস্থানে থাকলে নরমাল ডেলিভারি করা অনেকটা সহজ হয়। এই অবস্থানকে ডাক্তারি ভাষায় ‘সেফালিক’ প্রেজেন্টেশন বা পজিশন বলা হয়।
তবে কিছু ক্ষেত্রে শিশু গর্ভে এর উল্টো পজিশনে, অর্থাৎ নিতম্ব অথবা পা নিচে ও মাথা ওপরের দিকে দিয়ে থাকে। এই উল্টো অবস্থানকে ডাক্তারি ভাষায় ‘ব্রিচ’ পজিশন বলা হয়। এমন হলে শিশুর ডেলিভারির জন্য বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন হতে পারে। এই আর্টিকেলে ব্রিচ এর কারণ, চেনার উপায়, ঝুঁকি ও করণীয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
ব্রিচ পজিশন কতটা কমন?
গর্ভে ৩৯ সপ্তাহ পূর্ণ করে জন্মগ্রহণ করা শিশুদের ‘ফুল টার্ম’ বলা হয়। এমন প্রতি ১০০টি শিশুর মধ্যে ৩–৪টি শিশুর ক্ষেত্রে ব্রিচ পজিশন দেখা যায়। এই সময়ের আগে জন্মানো শিশুদের ক্ষেত্রে ব্রিচ পজিশনে জন্মানোর প্রবণতা আরও বেশি।
যেমন, গর্ভাবস্থার ৩২ সপ্তাহে জন্মানো ১০০টা শিশুর মধ্যে ৭টা শিশুর ব্রিচ পজিশনে জন্মানোর সম্ভাবনা থাকে। ২৮ সপ্তাহ বা এর আগে জন্মানো শিশুদের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৫ শতাংশে, মানে প্রতি ৪ জনে ১ জন শিশু ব্রিচ পজিশনে জন্মায়।
আবার আগের গর্ভাবস্থায় শিশু ব্রিচ প্রেজেন্টেশন নিয়ে জন্মালে মায়ের পরবর্তী গর্ভাবস্থাতেও শিশুর ব্রিচ প্রেজেন্টেশনে জন্মানোর সম্ভাবনা থাকে। প্রথম শিশুর ডেলিভারি ব্রিচ প্রেজেন্টেশন হলে দ্বিতীয় গর্ভধারণে ব্রিচ প্রেজেন্টেশন হবার সম্ভাবনা থাকে প্রায় ১০ শতাংশ। যেটি আবার তৃতীয় গর্ভধারণের ক্ষেত্রে বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ শতাংশে।
এ ছাড়া আগের গর্ভাবস্থায় সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে শিশুর ডেলিভারি হয়ে থাকলে, সেক্ষেত্রেও পরবর্তী গর্ভাবস্থায় ব্রিচ প্রেজেন্টেশনের সম্ভাবনা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।
শিশুর ব্রিচ অবস্থানের কারণ
ব্রিচ পজিশনের কারণ সবসময় জানা যায় না। তবে নিচের ঘটনাগুলো শিশুর ব্রিচ পজিশনের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে—
গর্ভে শিশু কোন অবস্থানে আছে সেটা আপনার জন্য বোঝা কঠিন হতে পারে। তাই শিশু ডেলিভারির জন্য সঠিক অবস্থানে আছে কি না জানতে নিয়মিত গর্ভকালীন চেকআপে যাবেন। চেকআপের সময়ে ডাক্তার আপনার পেটে হাত রেখে পরীক্ষা করবেন। এভাবে শিশু ব্রিচ পজিশনে থাকলে তিনি সেটা বুঝতে পারবেন।
ডাক্তার মূলত আপনার পেটের বিভিন্ন জায়গায় আলতো চাপ দিয়ে গর্ভে শিশুর অবস্থান বোঝার চেষ্টা করবেন। এভাবে তিনি আপনার পেটের ভেতর শিশুর মাথা, পিঠ, পা ও নিতম্বের অবস্থান খুঁজে বের করবেন। ব্রিচ পজিশনে থাকলে শিশুর মাথা ওপরের দিকে এবং নিতম্ব ও/অথবা পা নিচের দিকে থাকবে। শিশুর পিঠ আপনার শরীরের যেকোনো একপাশে ঘুরানো থাকবে। এর সাথে ডাক্তার পেলভিক (যোনিপথে হাত ঢুকিয়ে) পরীক্ষা করতে পারেন।
শিশু ব্রিচ পজিশনে আছে কি না সেই ব্যাপারে নিশ্চিত হতে ডাক্তার আপনাকে আল্ট্রাসাউন্ড করানোর পরামর্শ দিবেন
গর্ভের শিশু যদি ৩৬তম সপ্তাহের পরও ব্রিচ পজিশনে থাকে, তাহলে ডাক্তার নিচের বিষয়গুলো নিয়ে আপনার সাথে আলোচনা করবেন—
একটা বিষয় মাথায় রাখা জরুরি—ব্রিচ পজিশনে থাকা শিশুকে নরমাল পদ্ধতিতে ডেলিভারি করানোর সময় জটিলতা দেখা দিতে পারে, এমনকি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সিজার করানোর প্রয়োজন হতে পারে। তাই এই বিষয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকবেন।
গর্ভকালীন ৩৬তম সপ্তাহেও শিশু ব্রিচ অবস্থানে থাকলে ডাক্তার একটা বিশেষ পদ্ধতির সাহায্যে শিশুকে নরমাল ডেলিভারির উপযোগী অবস্থানে আনার চেষ্টা করতে পারেন। ডাক্তারি ভাষায় এর নাম ‘এক্সটার্নাল সেফালিক ভারসন’। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রিটার্ম ডেলিভারি বা অকাল প্রসবের ঝুঁকি এড়াতে গর্ভকালীন ৩৭ সপ্তাহে বা তারপরে এই পদ্ধতি চেষ্টা করা হয়।
এক্সটার্নাল সেফালিক ভারসন চেষ্টা করার আগে ডাক্তার পদ্ধতিটি আপনার ও গর্ভের শিশুর জন্য নিরাপদ কি না সেটি বিবেচনা করবেন। সেই অনুযায়ী পদ্ধতিটির সুবিধা-অসুবিধা ও ঝুঁকি সম্পর্কে আপনার সাথে আলোচনা করে নিবেন।
এক্ষেত্রে গর্ভবতীর পেটে চাপ দিয়ে দিয়ে গর্ভের শিশুকে নরমাল ডেলিভারির জন্য উপযুক্ত পজিশনে আনা হয়। অর্থাৎ মাথা নিচে ও পা ওপরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। পদ্ধতিটি প্রায় ৫০% ক্ষেত্রেই সফল হয়।
এটা একটা নিরাপদ প্রক্রিয়া, এতে পেট কাটার বা কোনো অপারেশন করার প্রয়োজন হয় না। তবে শিশুকে ঘোরানোর সময়ে কিছুটা অস্বস্তি লাগতে পারে।
এক্ষেত্রে একটা বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে—এক্সটার্নাল সেফালিক ভারসন অবশ্যই হাসপাতালে বা অভিজ্ঞ গাইনি ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে করাতে হবে। যেন মা অথবা শিশুর কোনো ধরনের সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এটা সচরাচর ডেলিভারি রুম বা অপারেশন থিয়েটারের কাছেই করানো হয়, যেন প্রয়োজনে জরুরি ভিত্তিতে সিজার করিয়ে মা ও শিশুকে সুস্থ রাখা যায়।
নিচে পদ্ধতিটি সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে—
কখন এক্সটার্নাল সেফালিক ভারসন করা যাবে না
নিচের ক্ষেত্রগুলোতে এক্সটার্নাল সেফালিক ভারসন করা হয় না—
এক্সটার্নাল সেফালিক ভারসনের জটিলতা
এক্সটার্নাল সেফালিক ভারসনে সাধারণত তেমন জটিলতা সৃষ্টি হয় না। তবে কিছু ক্ষেত্রে নিচের জটিলতাগুলো দেখা দিতে পারে—
অনেকে মনে করেন কিছু নির্দিষ্ট অবস্থানে শুয়ে অথবা বসে থাকলে, কিংবা কোনো বিশেষ টোটকা ব্যবহারে শিশু ব্রিচ পজিশন থেকে স্বাভাবিক অবস্থানে চলে আসবে।
যেমন, কেউ কেউ হয়তো শুনে থাকবেন বিছানায় হামাগুড়ি দিলে, বেশি করে হাঁটলে, পেটের মধ্যে টর্চ লাইটের আলো ফেললে কিংবা কমলা লেবুর শরবত খেলে ব্রিচ শিশুর পজিশন স্বাভাবিক হয়ে যায়।
তবে এসবের পক্ষে এখনো পর্যন্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই যেকোনো ধরনের পদ্ধতি চেষ্টা করার আগে ডাক্তারের সাথে আলোচনা করে তা আপনার ও গর্ভের শিশুর জন্য নিরাপদ কি না তা বুঝে নিন।