
Written by
Published at
November 27, 2025
গর্ভাবস্থায় রক্ত পরীক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।এর মাধ্যমে আপনার এবং আপনার গর্ভের শিশুর স্বাস্থ্য সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যায়।র্ভবতী নারীর শারীরিক অবস্থার সঠিক ও বিশদ ধারণা পাওয়ার জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়ে থাকে।এর মধ্যে রয়েছে কিছু রক্ত পরীক্ষা, যেগুলো গর্ভাবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।গর্ভাবস্থায় রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত দিক পরীক্ষা করা হয়, যেমন – গর্ভাবস্থা নিশ্চিত করা (hCG পরীক্ষা), রক্তাল্পতা (anemia) পরীক্ষা, এবং লিভার ও কিডনির কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা। প্রথম ত্রৈমাসিকে (first trimester) শিশুর কোনো ত্রুটি আছে কিনা, তা দেখার জন্য সাধারণত একটি রক্ত পরীক্ষা এবং আল্ট্রাসাউন্ড করা হয়।এছাড়াও, গর্ভাবস্থাকালীন ডায়াবেটিস এবং অন্যান্য জটিলতা আছে কিনা, তাও এই পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে জানা যায়।
রক্ত পরীক্ষায় যেসব বিষয় দেখা হয়
গর্ভাবস্থায় সাধারণত নিচের রক্ত পরীক্ষাগুলো করাতে হয়—
রক্তের গ্রুপ
থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা
সাধারণ রক্ত পরীক্ষা
. Pregnancy Test (hCG Test): গর্ভধারণ নিশ্চিত করতে এই পরীক্ষা করা হয়,কারণ গর্ভাবস্থায় শরীরে বিটা-hCG হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়।
Anemia Test: গর্ভাবস্থায় রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া একটি সাধারণ সমস্যা।রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা এবং লোহিত রক্তকণিকার পরিমাণ পরীক্ষা করে এটি নির্ণয় করা যায়।
Blood Group and Rh Factor: মায়ের রক্তের গ্রুপ এবং Rh ফ্যাক্টর জানা থাকা জরুরি,কারণ এটি শিশুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা
লিভার এবং কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা: গর্ভাবস্থায় মা এবং শিশুর স্বাস্থ্য ভালো রাখতে লিভার ও কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়।
প্রোটিনের মাত্রা পরীক্ষা: রক্ত ও প্রস্রাবে প্রোটিনের মাত্রা পরীক্ষা করা হয়।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস পরীক্ষা:গর্ভাবস্থার প্রথম ৮ সপ্তাহেই কিছু রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস শনাক্ত করা যেতে পারে।
প্রথম ত্রৈমাসিক স্ক্রীনিং (First Trimester Screening): এই পরীক্ষায় মায়ের রক্ত পরীক্ষা এবং শিশুর একটি আল্ট্রাসাউন্ড অন্তর্ভুক্ত থাকে।এটি গর্ভাবস্থার ১২তম বা ১৩তম সপ্তাহে করা হয় এবং এটি শিশুর কোনো জন্মগত ত্রুটি আছে কিনা তা শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি
কিছু পরীক্ষা, যেমন hCG পরীক্ষার জন্য, পিরিয়ড মিস হওয়ার পর অন্তত এক সপ্তাহ অপেক্ষা করা উচিত, যাতে সঠিক ফলাফল পাওয়া যায়।
কিছু পরীক্ষার (যেমন, বিটা-hCG পরীক্ষা) জন্য নির্দিষ্ট কিছু খাবার (যেমন, আমিষ, শুকনো ফল, আলু) ২৪ ঘণ্টা আগে না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে, কারণ এগুলো পরীক্ষার ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
গর্ভাবস্থায় সাধারণত যে ধরনের রক্ত পরীক্ষা করা হয়, তার মধ্যে কয়েকটি প্রধান হলো:
১. গর্ভাবস্থা নিশ্চিতকরণ (HCG পরীক্ষা):
এর দুটি প্রকার:
গুণগত hCG পরীক্ষা: আপনি গর্ভবতী কিনা শুধু সেটাই দেখায় (হ্যাঁ/না)।
পরিমাণগত hCG পরীক্ষা: রক্তে hCG হরমোনের সঠিক পরিমাণ পরিমাপ করে, যা গর্ভাবস্থার অগ্রগতি সম্পর্কে ধারণা দেয়।
২. সম্পূর্ণ রক্ত গণনা (CBC - Complete Blood Count):
. রক্তাল্পতা (Anemia) আছে কিনা তা পরীক্ষা করে। গর্ভাবস্থায় রক্তাল্পতা খুব সাধারণ এবং এটি মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
শ্বেত রক্তকণিকা, লোহিত রক্তকণিকা ও প্লেটলেটের মাত্রা পরীক্ষা করা হয়।
৩. রক্তের গ্রুপ এবং Rh ফ্যাক্টর পরীক্ষা:
. আপনার রক্তের গ্রুপ (A, B, O, AB) এবং Rh ফ্যাক্টর (পজেটিভ বা নেগেটিভ) নির্ণয় করা হয়।
যদি মা Rh নেগেটিভ হন এবং বাবা Rh পজেটিভ হন, তবে গর্ভাবস্থায় বিশেষ যত্নের প্রয়োজন হয়, কারণ Rh ফ্যাক্টরজনিত জটিলতা দেখা দিতে পারে।
৪. সংক্রামক রোগ স্ক্রিনিং:
কিছু সংক্রামক রোগ (যেমন: হেপাটাইটিস বি, সিফিলিস, HIV, রুবেলা) আছে কিনা তা পরীক্ষা করা হয়। এই রোগগুলি গর্ভাবস্থায় বা প্রসবের সময় শিশুর মধ্যে যেতে পারে।
কখন রক্ত পরীক্ষা করা হয়
সাধারণত রক্ত পরীক্ষার জন্য খালি পেটে থাকা প্রয়োজন, তবে কিছু ক্ষেত্রে খালি পেটে থাকা আবশ্যক নয়। খালি পেটে রক্তের গ্লুকোজ (Fasting Blood Sugar) পরীক্ষা করাতে হলে অন্তত ৮ ঘণ্টা এবং চর্বি পরীক্ষা (Lipid Profile) করাতে হলে ৯-১২ ঘণ্টা কিছু না খেয়ে থাকতে হয়। অন্যদিকে, HbA1c পরীক্ষা করার জন্য সাধারণত খালি পেটে থাকার প্রয়োজন হয় না।
খালি পেটে পরীক্ষা
রক্তের গ্লুকোজ: অন্তত ৮ ঘণ্টা খালি পেটে থাকতে হয়।
রক্তে চর্বির মাত্রা (Lipid Profile): ৯-১২ ঘণ্টা খালি পেটে থাকার নিয়ম।
খালি পেটে না থেকেও পরীক্ষা
কখন পরীক্ষা করানো উচিত
ডেঙ্গু পরীক্ষা: ডেঙ্গুর জ্বরের প্রথম দিন থেকেই এনএসওয়ান অ্যান্টিজেন পরীক্ষা এবং চার-পাঁচ দিন পর আইজিএম অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করানো যেতে পারে।
বিয়ের আগে: বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়ার মতো রোগ নির্ণয়ের জন্য রক্ত পরীক্ষা করানো উচিত।
গর্ভাবস্থায়: গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং অন্যান্য পরীক্ষা যেমন রক্তের গ্রুপ, হিমোগ্লোবিন ইত্যাদি করা প্রয়োজন।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
এসময়ে আপনার রক্তের হিমোগ্লোবিন আবার পরীক্ষা করা হবে। সেই সাথে প্রস্রাবও পরীক্ষা করা হবে।কিছু ক্ষেত্রে প্রথম ওজিটিটি ফলাফল স্বাভাবিক হওয়া সত্ত্বেও ২৪–২৮ সপ্তাহের মধ্যে আবারও পরীক্ষা করতে হতে পারে। যেমন—
যদি আপনার গর্ভাবস্থা সংক্রান্ত বাড়তি ঝুঁকি থাকে
যদি পূর্বের কোনো গর্ভাবস্থায় আপনার গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হয়ে থাকে
যদি আপনার পরিবারে কারোর ডায়াবেটিস থেকে থাকে
যদি আপনি স্থুলতায় ভুগেন
এসময়ে আবারও আপনার রক্তের হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা করা হবে। সেই সাথে প্রস্রাবও পরীক্ষা করা হবে।
গর্ভাবস্থার ৩৬ থেকে ৩৮ সপ্তাহের ভেতর
সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে গর্ভাবস্থার এই সময়ে শেষবারের মতো আপনার রক্তের হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা করা হবে। গর্ভবতী নারীদের রক্তশূন্যতা দেখা দেওয়া খুব কমন বলে এই পরীক্ষাটি বার বার করা হয়ে থাকে। এই সময়ের মধ্যে আপনার প্রস্রাব পরীক্ষা ও আলট্রাসনোগ্রাফিও করানো হবে।
ব্যতিক্রম
কিছু ক্ষেত্রে ডাক্তার আপনাকে এই সময়কালের বাইরে ভিন্ন শিডিউলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিতে পারেন। এমনকি কিছু পরীক্ষা পুনরায় করার পরামর্শও দিতে পারেন। এমন ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে—
আগে থেকে কোনো স্বাস্থ্য জটিলতা থাকা
এ ছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে কিছু বিশেষ পরীক্ষা করা হতে পারে। যেমন: লিভারের রোগ নির্ণয়ের জন্য এসজিপিটি/এএলটি (SGPT/ALT), কিডনির রোগ নির্ণয়ের জন্য সিরাম ক্রিয়েটিনিন, এইচবিএ১সি (HbA1C) এবং রক্ত জমাট বাঁধার ব্লিডিং টাইম, ক্লটিং টাইম ও প্রোথ্রমবিন টাইম পরীক্ষা।
রক্ত পরীক্ষা খুবই নিরাপদ একটি পরীক্ষা। শুধু গর্ভাবস্থাতেই নয়,সাধারণ সময়েও বিভিন্ন কারণে রক্ত পরীক্ষা করা হয়ে থাকে।সাধারণত রক্ত পরীক্ষার পর কারোরই তেমন কোনো সমস্যা হয় না।তবে সামান্য কিছু ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে।যেমন—
সুঁই ফুটানোর স্থানে ব্যথা
মাথা ঘুরানো
অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ
সুঁই ফুটানোর স্থানে ইনফেকশন
এলার্জি
বিরল ক্ষেত্রে সুঁই, সিরিঞ্জ বা ল্যান্সেটের মাধ্যমে ভাইরাসের সংক্রমণ—এটি প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে সবসময় স্টেরাইল সুঁই-সিরিঞ্জের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। রক্ত সংগ্রহ করার পদ্ধতি যথাসম্ভব জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে
রক্ত পরীক্ষা থেকে যেসব তথ্য সংগ্রহ করা হয় তা আপনার ও আপনার সন্তানের সুস্থতা নিশ্চিত করতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই যথাসময়ে এসব পরীক্ষা করে ফেলাই ভালো।