
Written by
Published at
November 28, 2025
প্রি-এক্লাম্পসিয়া বা গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ জনিত জটিলতা
প্রি-এক্লাম্পসিয়া (Pre-eclampsia) হল গর্ভাবস্থার একটি গুরুতর জটিলতা,যা সাধারণত গর্ভাবস্থার ২০ সপ্তাহ পর দেখা দেয়।যদিও কিছু ক্ষেত্রে প্রসবের পরেও দেখা যেতে পারে।এটি মা এবং গর্ভস্থ শিশু উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক হতে পারে।প্রধানত উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন) এবং প্রস্রাবে প্রোটিনের উপস্থিতি (প্রোটিনিউরিয়া) এই রোগের মূল লক্ষণ তবে,কিছু ক্ষেত্রে প্রস্রাবে প্রোটিন না থাকলেও লিভার,কিডনি বা রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা হতে পারে।সন্তান জন্মের পরে প্রথম ৬ সপ্তাহের মধ্যেও প্রথমবারের মত এই সমস্যা দেখা যেতে পারে, যদিও এরকম ঘটনা খুব বেশি দেখা যায় না।বেশিরভাগ গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে প্রি-এক্লাম্পসিয়ার উপসর্গগুলো বেশ মৃদু হয়,তবুও দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ,না হলে বিভিন্ন রকম জটিল উপসর্গ বা শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।
প্রথম দিকে কি কি উপসর্গ দেখা দিতে পারে?
প্রথম দিকে প্রি-এক্লাম্পসিয়ার লক্ষণগুলো হল:
প্রস্রাবের সাথে প্রোটিন অর্থাৎ আমিষ বের হয়ে যাওয়া।
এই উপসর্গগুলোর কোনটিই আপনি হয়ত বাড়িতে বসে বুঝতে পারবেন না,কিন্তু আপনার ডাক্তারের কাছে বা নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়মিত গর্ভকালীন পরীক্ষা নিরীক্ষার সময় এগুলো ধরা পড়ে যায়। গর্ভবতী নারীদের মধ্যে শতকরা ১০ থেকে ১৫ জনই উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন। তাই কেবল রক্তচাপ বেশি হলেই প্রি-এক্লাম্পসিয়া হয়েছে, এমন বলা যাবে না। কিন্তু উচ্চ রক্তচাপের সাথে প্রস্রাবে প্রোটিন গেলে, তা প্রি-এক্লাম্পসিয়াকেই নির্দেশ করে।
প্রধান লক্ষণ ও উপসর্গ:
সাধারণত কাদের প্রি-এক্লাম্পসিয়া হয়?
গর্ভবতী নারীদের মধ্যে ৬% এর মৃদু প্রি-এক্লাম্পসিয়া হতে পারে।আর ১% থেকে ২% ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।
কিছু কিছু কারণে প্রি-এক্লাম্পসিয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়, যেমন:
আগে কখনো যদি গর্ভাবস্থায় প্রি-এক্লাম্পসিয়া হয়ে থাকে।
আরও কিছু কারণে আপনার প্রি-এক্লাম্পসিয়ার ঝুঁকি সামান্য বেশি থাকতে পারে:
আপনার বিএমআই যদি ৩৫ বা তার বেশি হয়।
আপনার যদি এগুলোর মধ্যে ২টি বা তার বেশি উপসর্গ একসাথে থাকে তাহলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
যদি প্রি-এক্লাম্পসিয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে তাহলে ডাক্তার আপনাকে গর্ভাবস্থার ১২ সপ্তাহ থেকে সন্তানের জন্ম হওয়া পর্যন্ত কম ডোজের এসপিরিন নেয়ার পরামর্শ দিতে পারেন। তবে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনভাবেই এই ওষুধ খাওয়া যাবেনা।
প্রি-এক্লাম্পসিয়া কেন হয়?
যদিও প্রি-এক্লাম্পসিয়ার সঠিক কারণ জানা নেই,মনে করা হয় অমরা বা গর্ভফুলের (যে অঙ্গটি মা ও সন্তানের রক্ত প্রবাহের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে) সমস্যা হলে প্রি-এক্লাম্পসিয়া হতে পারে।
জটিলতা:
চিকিৎসা না করা হলে প্রি-এক্লাম্পসিয়া থেকে মারাত্মক জটিলতা হতে পারে, যেমন:
ঝুঁকির কারণ:
স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন।
চিকিৎসা ও করণীয়:
প্রি-এক্লাম্পসিয়ার সঠিক কারণ এখনো জানা যায়নি বলে এর নির্দিষ্ট কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেই। তবে দ্রুত শনাক্তকরণ এবং নিয়মিত চিকিৎসা জটিলতা কমাতে পারে।
অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া: উপরে উল্লিখিত কোনো লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি ভিত্তিতে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করা উচিত।
নিয়মিত পরীক্ষা: রুটিন প্রসবপূর্ব চেক-আপে রক্তচাপ ও প্রস্রাব পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
ওষুধ: রক্তচাপ কমানোর জন্য ডাক্তার ওষুধ দিতে পারেন।
পর্যবেক্ষণ: গুরুতর ক্ষেত্রে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি রেখে মা ও শিশুর নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
প্রসব: বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিশুর জন্ম না হওয়া পর্যন্ত প্রি-এক্লাম্পসিয়া সম্পূর্ণ ভালো হয় না। পরিস্থিতি গুরুতর হলে মা ও শিশুর জীবন বাঁচাতে দ্রুত প্রসব করানো লাগতে পারে।
প্রি-এক্লাম্পসিয়ার চিকিৎসা কি?
প্রি-এক্লাম্পসিয়া শনাক্ত হলে, আপনাকে দ্রুত একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শে চিকিৎসা নিতে হবে। অবস্থা বেশি মারাত্মক মনে হলে তিনি আপনাকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেবেন। হাসপাতালে থাকা অবস্থায় আপনাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে আপনার অবস্থা কতটুকু মারাত্মক ও আপনাকে কতদিন হাসপাতালে থাকতে হবে সেই ব্যাপারে আপনার চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেবেন।সাধারণত সন্তান প্রসবের পর পরই প্রি-এক্লাম্পসিয়া ভালো হয়ে যায় । তাই যতক্ষণ পর্যন্ত নিরাপদে সন্তান প্রসব করানো সম্ভব হচ্ছে না, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হবে ।সাধারণত গর্ভাবস্থার ৩৭ থেকে ৩৮ সপ্তাহের মধ্যে নিরাপদে সন্তান প্রসব করানো যায় । কিন্তু অবস্থা মারাত্মক হয়ে গেলে আরও আগে কৃত্রিমভাবে বা ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে আপনার প্রসব করানোর চেষ্টা করা হতে পারে অথবা অপারেশন বা সিজারিয়ান সেকশন ও করা হতে পারে।প্রসবের আগ পর্যন্ত রক্তচাপ কমানোর জন্য আপনাকে ওষুধ দেয়া হতে পারে।
প্রি-এক্লাম্পসিয়ার কারণে কি জটিলতা দেখা দিতে পারে?
যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রি-এক্লাম্পসিয়া হলে তেমন কোন সমস্যা হয় না ও সন্তান জন্মের পর এ অবস্থা ভালো হয়ে যায় তারপরও মা ও শিশুর কিছু জটিলতার ঝুঁকি থেকেই যায়।কিছু ক্ষেত্রে মায়ের খিঁচুনি হতে পারে, যাকে ‘এক্লাম্পসিয়া’ বলা হয় এবং এটি মা ও গর্ভের সন্তানের জীবনের জন্য হুমকিস্বরুপ। তবে এই ঘটনা সাধারণত বিরল।
গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, গর্ভাবস্থায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সচেতনতা এই জটিলতা এড়াতে বা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।