গর্ভাবস্থায় বাচ্চার নড়াচড়া
গর্ভবতী অবস্থায় পেটের ভেতরে শিশুর নড়াচড়া টের পাওয়া একটি স্বাভাবিক ঘটনা।গর্ভের শিশুর নড়াচড়া থেকে শিশুর সুস্থতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যায়। তবে এই নড়াচড়া একেকজনের ক্ষেত্রে একেকরকম হয়ে থাকে। তাই মোটা দাগে নড়াচড়ার পরিমাণ ও ধরন স্বাভাবিক না কি অস্বাভাবিক সেটি বলে দেওয়া কঠিন।
গর্ভের শিশু নড়াচড়া করছে কি না যেভাবে বুঝবেন
গর্ভাবস্থায় গর্ভের শিশুর নড়াচড়া অনুভব করা একটি স্বাভাবিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রথম দিকে নড়াচড়া বুঝতে কিছুটা অসুবিধা হতে পারে, বিশেষত যদি আপনি প্রথমবার মা হন।
কখন প্রথম নড়াচড়া বোঝা যায়?
- প্রথমবার মা হলে সাধারণত ১৬ থেকে ২৪ সপ্তাহের মধ্যে আপনি আপনার শিশুর নড়াচড়া অনুভব করতে শুরু করতে পারেন।
- কারো কারো ক্ষেত্রে ২০ সপ্তাহের পরেও হতে পারে।
- প্রথম দিকে এই নড়াচড়া খুব মৃদু হতে পারে।
প্রথম নড়াচড়া কেমন মনে হতে পারে?
প্রথম দিকে শিশুর নড়াচড়াগুলো সাধারণত এই রকম মনে হতে পারে:
- ফ্ল্যাটারিং (পেটের ভেতর প্রজাপতির ডানা ঝাপটানোর মতো)।
- পেটে বুদবুদ ওঠার বা গ্যাসের মতো অনুভূতি।
- ঘোলাটে বা মৃদু ধাক্কার মতো।
- গর্ভাবস্থা যত এগোতে থাকে, নড়াচড়া তত শক্তিশালী হতে থাকে, যেমন: লাথি মারা, হাত-পা ছোড়া, মোচড় দেওয়া বা গড়াগড়ি খাওয়ার মতো।
শিশুর নড়াচড়ার ধরণ কীভাবে বুঝবেন?
- নিয়মানুবর্তিতা: সাধারণত ২৮ সপ্তাহ থেকে আপনার শিশুর নড়াচড়ার একটা নির্দিষ্ট ধরণ তৈরি হয়। আপনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনার শিশুর স্বাভাবিক নড়াচড়ার ধরণটি জেনে নেওয়া।
- কখন নড়াচড়া বেশি হয়: সাধারণত আপনি যখন বিশ্রাম নেন বা শুয়ে থাকেন (বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর সময়) তখন শিশুর নড়াচড়া বেশি অনুভব করতে পারেন। খাবার খাওয়ার পরেও অনেক শিশুর নড়াচড়া বাড়ে।
- কম নড়াচড়া: আপনার শিশুর নড়াচড়ার স্বাভাবিক ধরনে কোনো পরিবর্তন আসলে বা নড়াচড়া কম মনে হলে তা উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ:
- আপনার শিশুর নড়াচড়া যদি স্বাভাবিকের চেয়ে কম মনে হয় বা আপনি আর নড়াচড়া অনুভব না করেন, তবে তাৎক্ষণিকভাবে আপনার ডাক্তার বা নিকটস্থ মাতৃত্বকালীন ইউনিটে যোগাযোগ করুন। পরের দিনের জন্য অপেক্ষা করবেন না।
- বাড়িতে ডপলার যন্ত্র (যা দিয়ে শিশুর হার্টবিট শোনা যায়) ব্যবহার করে শিশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার চেষ্টা করবেন না, কারণ এটি নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি নয়।
মাস অনুযায়ী শিশুর নড়াচড়া
১ম থেকে ৩য় মাস (প্রথম ত্রৈমাসিক): এই সময়ে ভ্রূণের নড়াচড়া শুরু হলেও, আকারে খুব ছোটো থাকার কারণে মায়ের পক্ষে তা অনুভব করা যায় না।
৪র্থ মাস: কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষত দ্বিতীয়বার মা হলে, এই মাসের শেষ দিকে কেউ কেউ খুব হালকা ঝাঁকুনি বা ঢেউয়ের মতো (quickening/fluttering) অনুভূতি পেতে পারেন। প্রথমবার মা হলে সাধারণত এই সময় নড়াচড়া বোঝা যায় না।
৫ম মাস:
- এই সময় থেকেই বেশিরভাগ মা প্রথমবার শিশুর নড়াচড়া স্পষ্ট বুঝতে শুরু করেন।
- প্রথম দিকে এটি বুদবুদ বা মাছ সাঁতার কাটার মতো অনুভূতি হতে পারে।
- মাস গড়িয়ে যাওয়ার সাথে সাথে নড়াচড়া আরও শক্তিশালী হতে থাকে।
৬ষ্ঠ মাস:
- শিশুর নড়াচড়া আরও নিয়মিত এবং শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
- লাথি (kicks) এবং হাত-পায়ের ঝটপটানি (jabs) স্পষ্ট বোঝা যায়।
- শিশু বাইরের শব্দ এবং মায়ের কার্যকলাপের প্রতি সাড়া দিতে শুরু করে।
৭ম ও ৮ম মাস:
- নড়াচড়া এই সময় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় এবং খুব জোরালো হতে পারে।
- শিশু ঘুম ও জেগে থাকার একটি নির্দিষ্ট চক্র তৈরি করে।
- পেটের ভেতরে শিশুর ঘোরাঘুরি, লাথি মারা, কনুই বা হাঁটুর গুঁতো স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়।
- হিক্কা (hiccups) অনুভূত হতে পারে, যা ছন্দবদ্ধ ছোটো ছোটো ঝাঁকুনির মতো লাগে।
৯ম মাস (শেষের দিকে):
- শিশু আকারে অনেক বড় হয়ে যায় এবং জরায়ুর ভেতরে জায়গা কমে আসে।
- তাই এই সময়ে নড়াচড়ার ধরন পাল্টে যেতে পারে। জোরালো লাথির বদলে শিশু এখন বেশি মোচড়ানো বা গড়ানোর মতো (rolling and wiggling) নড়াচড়া করে।
- তবে, নড়াচড়ার ফ্রিকোয়েন্সি (বারবারতা) বা সংখ্যা স্বাভাবিক থাকা গুরুত্বপূর্ণ। যদি নড়াচড়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করা উচিত।
শিশুর নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ জরুরি কেন
- শিশুর সুস্থতার ইঙ্গিত: শিশুর নড়াচড়া একটি স্বাভাবিক লক্ষণ যা তার সুস্থতা বোঝায়।
- সমস্যা চিহ্নিতকরণ: যদি শিশুর নড়াচড়া হঠাৎ কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে এটি কোনো অন্তর্নিহিত সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
- সম্ভাব্য কারণ:
জরায়ুর পানি অতিরিক্ত কমে যাওয়া।
গর্ভফুল (placenta) স্বাভাবিকের চেয়ে সামনে থাকা।
মা যদি কোনো বিশেষ ধরনের ঔষধ খান।
মায়ের কোনো শারীরিক বা মানসিক জটিলতা।
শিশুর শ্বাসকষ্ট।
- ঝুঁকি এড়ানো: অস্বাভাবিক নড়াচড়ার কারণ দ্রুত নির্ণয় ও সমাধান করলে গুরুতর ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে
- ৩০ সপ্তাহের পর থেকে নড়াচড়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত।
- যদি মনে হয় শিশুর নড়াচড়া স্বাভাবিকের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, তাহলে দেরি না করে দ্রুত ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।
- ডাক্তার একটি কার্ডিওটোকোগ্রাফ (CTG) পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুর হৃদস্পন্দন পরীক্ষা করতে পারেন।
গর্ভাবস্থায় শিশুর নড়াচড়া বেড়ে গেলে করণীয়
গর্ভের শিশুর নড়াচড়া বেড়ে গিয়েছে বলে মনে হলেও সেটি নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। তবে নড়াচড়ার স্বাভাবিক ধরনে পরিবর্তন আসলে সেটি শঙ্কার কারণ হতে পারে। তাই শিশু কতবার নড়াচড়া করছে সেটি হিসাব করার চেয়ে প্রতিদিনের নড়াচড়ার ধরনটি সঠিকভাবে বুঝতে পারার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। এতে গর্ভের শিশুর স্বাভাবিক নড়াচড়ার ধরন সম্পর্কে মোটামুটি সঠিক ও নিশ্চিত একটি ধারণা তৈরি হবে। ফলে স্বাভাবিক ধরনে পরিবর্তন আসলে সেটি খেয়াল করা সহজ হবে।শিশুর নড়াচড়ার ধরনে যেকোনো পরিবর্তন আসলে অবশ্যই ডাক্তার অথবা নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র (যেমন: কমিউনিটি ক্লিনিক, স্যাটেলাইট ক্লিনিক, সদর হাসপাতাল)—এর প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে চেকআপ করিয়ে নিতে হবে।