
Written by
Published at
November 25, 2025
গর্ভধারণের ৩৬তম সপ্তাহ
গর্ভধারণের ৩৬তম সপ্তাহটি গর্ভাবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়, যা তৃতীয় ত্রৈমাসিকের প্রায় শেষ। গর্ভাবস্থার ৩৬তম সপ্তাহে আপনার শিশুর আকার যথেষ্ট বড় হয়ে গেছে এবং সে সম্ভবত প্রসবের জন্য পেলভিসে মাথা নিচু করে প্রস্তুত (বা 'engage') হতে শুরু করেছে। যদিও প্রসব যেকোনো সময় হতে পারে, তবে স্বাভাবিক প্রসবের জন্য ৩৭ থেকে ৪২ সপ্তাহের মধ্যে হওয়া নিরাপদ বলে মনে করা হয়। এই সময়ে, শিশু আরও বড় হওয়ার কারণে তার নড়াচড়া কিছুটা কমে যেতে পারে, তবে আপনি এখনও তার নড়াচড়া অনুভব করবেন এবং এর নিয়মিততা সম্পর্কে সচেতন থাকা গুরুত্বপূর্ণ। এই সপ্তাহে আপনার নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত।
গর্ভধারণের ৩৬তম সপ্তাহটি গর্ভাবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়, যা তৃতীয় ত্রৈমাসিকের প্রায় শেষ। এই সময়ে আপনার এবং আপনার শিশুর মধ্যে নিম্নলিখিত পরিবর্তন ও লক্ষণগুলি দেখা যেতে পারে:
শিশুর বিকাশ (Baby's Development)
ভারনিক্স (Vernix) ও লানুগো (Lanugo): শিশুর ত্বকের সুরক্ষাকারী সাদা স্তর 'ভারনিক্স' এবং সূক্ষ্ম লোম 'লানুগো' ঝরে যেতে শুরু করে। শিশু এগুলো হজম করে এবং এগুলো তার প্রথম মল, মিকোনিয়াম গঠনে সাহায্য করে।
মায়ের শারীরিক পরিবর্তন ও লক্ষণ (Mother's Changes and Symptoms)
পর্যাপ্ত পানীয়: ডিহাইড্রেশন এড়াতে প্রচুর পরিমাণে , পানি পান করুন।
যদি আপনার পানি ভেঙে যায়, তীব্র রক্তপাত হয় বা নিয়মিত ও তীব্র সংকোচন শুরু হয়, তাহলে অবিলম্বে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন।
৩৬ সপ্তাহে বাচ্চার বিকাশ (36 Weeks Baby Development)
৩৬ সপ্তাহে বাচ্চাটি ফুল টার্ম (পূর্ণকাল) হওয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
প্রথম মল (Mecconium): বাচ্চার অন্ত্রে এখন মেকোনিয়াম (প্রথম মল) জমা হতে শুরু করেছে।
গর্ভে এখন বাচ্চার নড়াচড়ার জন্য জায়গা কম, তাই সে হয়তো আগের মতো কসরত দেখাতে পারে না, তবে তার নড়াচড়া অনুভব করা উচিত। নড়াচড়ার পরিমাণ বা ধরনে কোনো পরিবর্তন দেখলে অবিলম্বে আপনার ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করা গুরুত্বপূর্ণ।
এই তথ্যগুলি সাধারণ নির্দেশিকা মাত্র। প্রতিটি বাচ্চার বৃদ্ধি ভিন্ন হতে পারে। আপনার বাচ্চার নির্দিষ্ট বিকাশ এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানতে আপনার ডাক্তার বা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর (healthcare provider) সাথে পরামর্শ করা সবচেয়ে ভালো।
গর্ভের শিশু বেড়ে ওঠার কারণে আপনাকে অতিরিক্ত ওজন বহন করতে হচ্ছে। তাই এসময়ে ক্লান্ত লাগা খুব স্বাভাবিক।
আলট্রাসনোগ্রাম ও অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা
সাধারণত গর্ভাবস্থার ৩৬তম–৩৮তম সপ্তাহের মধ্যে আপনাকে রক্ত পরীক্ষা, প্রস্রাব পরীক্ষা ও আলট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষা করাতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী এসব পরীক্ষার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে রাখবেন।এবারের আলট্রাসনোগ্রাম থেকে গর্ভের শিশুর অবস্থান, গর্ভফুলের অবস্থান, এমনিয়োটিক ফ্লুইড বা শিশুকে ঘিরে থাকা তরলের পরিমাণসহ অনেক কিছু জানা যাবে। অ্যাপয়েন্টমেন্টের তারিখ অনুযায়ী পরীক্ষা করানোর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রাখুন।
স্তনের বোঁটায় ব্যথা
শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহে স্তনের বোঁটায় ব্যথা করতে পারে। বুকের দুধ খাওয়াতে থাকলে সাধারণত ব্যথাটা ধীরে ধীরে চলে যায়।ব্যথা কমানোর জন্য কয়েকটা কাজ করতে পারেন। প্রতিবার খাওয়ানো শেষে একটুখানি বুকের দুধ চেপে বের করে সেটা স্তনের বোঁটায় লাগাতে পারেন। স্তনের বোঁটা থেকে স্তনের বাকি অংশে ব্যথা ছড়ালে হালকা গরম সেঁক দিতে পারেন।এসবের পাশাপাশি খেয়াল রাখবেন বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়ে শিশুর মুখের ভেতর যেন শুধুমাত্র স্তনের বোঁটা না থাকে। শিশু মুখ বড় করে হা করে স্তনের বোঁটাসহ বোঁটার আশেপাশের কালো অংশও মুখের ভেতর নিলে স্তনের বোঁটায় ব্যথা হওয়ার সম্ভাবনা কমবে।
ঘর গোছগাছ করা
এসময়ে এসে আপনার ক্লান্ত লাগা স্বাভাবিক। তবে এর মধ্যেই আপনার হঠাৎ করে গায়ে বেশ শক্তি আছে বলে মনে হতে পারে, পুরোদমে ঘর-বাড়ি গোছানোর ইচ্ছা জাগতে পারে ছোট্টমণির জন্য কিনে রাখা জামাকাপড় এখনই ভাঁজ করতে হবে কিংবা অনেক বছর ধরে অগোছালো কোনো ড্রয়ার বা আলমারি এই মুহূর্তেই পরিষ্কার করতে হবে—এমন তাড়না অনুভব করতে পারেন।অনেক হবু মা-ই এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান।নতুন শিশুকে স্বাগত জানানোর জন্য একটা স্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টির ইচ্ছা থেকে এমন হতে পারে। আপনি একা একা অতিরিক্ত পরিশ্রম না করে ঘর গোছানোর কাজগুলো বাসার সবাই মিলে ভাগ করে নিতে পারেন।
গর্ভের শিশুকে ঘুরিয়ে মাথা নিচের দিকে আনা
আপনার শিশু হয়তো ইতোমধ্যে তলপেটের গভীরে মাথা ঢুকিয়ে প্রসবের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। তবে শিশুর মাথা যদি নিচের দিকে না থাকে, তাহলে ডাক্তার একটা বিশেষ পদ্ধতিতে শিশুর অবস্থান পরিবর্তন করার পরামর্শ দিতে পারেন। এই পদ্ধতিকে ডাক্তারি ভাষায় ‘এক্সটারনাল সেফালিক ভার্সন’ বলা হয়। সাধারণত ৩৭তম সপ্তাহ পূর্ণ হবার পর প্রয়োজনে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।এই পদ্ধতির মাধ্যমে ডাক্তার পেটে বিশেষ পদ্ধতিতে আলতোভাবে চাপ দিয়ে গর্ভের শিশুকে ঘোরানোর চেষ্টা করেন। এভাবে শিশুর মাথা নিচে ও পশ্চাৎদেশ ওপরে—এমন অবস্থানে আনার চেষ্টা করা হয়। কারণ এটাই নরমাল ডেলিভারির জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থান।এই বিশেষ পদ্ধতি প্রায় ৫০% ক্ষেত্রে সফল হয়।
প্রসবের কাছাকাছি আসার লক্ষণ:
ব্র্যাক্সটন হিকস সংকোচন (Braxton Hicks Contractions): এই 'অনুশীলন সংকোচন'গুলো আরও ঘন ঘন এবং জোরালো হতে পারে, যা সত্যিকারের প্রসবের ব্যথার মতো অনুভূত হতে পারে।
শ্লেষ্মা প্লাগ (Mucus Plug) ক্ষরণ: জরায়ুর মুখ থেকে আঠালো শ্লেষ্মার একটি পিণ্ড বেরিয়ে আসতে পারে, যা প্রসব শুরু হওয়ার একটি লক্ষণ হতে পারে। এটি সামান্য রক্তাভও হতে পারে, যাকে "শো" (Show) বলা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ কথা:
বাচ্চার নড়াচড়া কমে গেলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
আপনার বা আপনার পরিচিত কারও যদি এই সময়ে কোনো গুরুতর বা অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দেয়, তবে চিকিৎসকের সাথে কথা বলা জরুরি।
রক্ত পরীক্ষা ও আলট্রাসনোগ্রামের কথা মনে করিয়ে দিন
সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে শিশুর মাকে শেষবারের মতো রক্ত পরীক্ষা, প্রস্রাব পরীক্ষা ও আলট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষা করাতে হবে।
ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষাগুলোর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে রাখার কথা মনে করিয়ে দিন। আগামী দিনগুলোতে, অর্থাৎ ৩৬তম সপ্তাহ থেকে প্রসবের আগ পর্যন্ত সপ্তাহে একবার করে সঙ্গীর চেকআপে যাওয়ার বিষয়টি মাথায় রাখুন।