
Written by
Published at
November 27, 2025
গর্ভপাত (Abortion বা Miscarriage) একটি শারীরিক ও মানসিক প্রক্রিয়া, যার পরে সুস্থতা লাভ করতে কিছুটা সময় লাগে।এই সময় নিজেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে যত্ন করা অত্যন্ত জরুরি।গর্ভপাত-পরবর্তী জীবনে শারীরিক ও মানসিক উভয় দিকেই যত্ন নেওয়া জরুরি।শারীরিক সুস্থতার জন্য প্রথম দুই সপ্তাহ সহবাস থেকে বিরত থাকতে হবে এবং রক্তপাতের বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য, বিশেষ করে মানসিক যন্ত্রণার ক্ষেত্রে, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন এবং এই বিষয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের মধ্যে সমন্বয় করা গুরুত্বপূর্ণ। বারবার গর্ভপাত হলে এর কারণ চিহ্নিত করতে এবং পরবর্তী গর্ভাবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে
গর্ভপাত একটি গভীর আবেগিক অভিজ্ঞতা হতে পারে।আপনার অনুভূতি ক্রমাগত পরিবর্তিত হতে পারে এবং এর জন্য নিজেকে দোষারোপ করা উচিত নয়।
গর্ভপাতের পরে বিভিন্ন ধরনের আবেগ আসা খুবই স্বাভাবিক। আপনি অনুভব করতে পারেন:
মেজাজ পরিবর্তন (Mood Swings): শরীরে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে মেজাজে দ্রুত পরিবর্তন আসতে পারে।
অনেকে নিজের অনুভূতি-অভিজ্ঞতা নিয়ে অন্যদের সাথে আলোচনা করলে কিছুটা আশ্বস্ত অথবা হালকা বোধ করেন। আবার অনেকের জন্য এই বিষয়ে কথা বলা খুবই কষ্টদায়ক হয়ে পড়ে। তাই আপনার যা ভালো লাগে সেটিই করুন।গর্ভপাতের পর অনেকের জন্য পুনরায় গর্ভধারণের কথা চিন্তা করাও কঠিন হয়ে যেতে পারে। আবার কেউ কেউ গর্ভপাতের পর পরই পরবর্তী গর্ভধারণের পরিকল্পনা শুরু করে ফেলেন। আপনি নিজের মন ও শরীরের সুস্থতার ওপর ভিত্তি করে আপনার পছন্দমাফিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।কারও কারও ক্ষেত্রে গর্ভপাতের পর সঙ্গীর সাথে সম্পর্কে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। আপনাকে এই কঠিন সময়ে সহায়তা দেওয়ার জন্য আপনার সঙ্গী নিজের অনুভূতিগুলো চেপে রাখতে পারেন। তাই নিজেদের মধ্যে এই বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করে নিলে ভালো হয়। এতে করে নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ও সমস্যা কিছুটা কম হতে পারে।মনোবল ফিরে পেতে ও স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরে আসার জন্য আপনি মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী সংস্থার সাহায্য নিতে পারেন। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের সাইকিয়াট্রি বিভাগে আপনি এরকম সহায়তা পেতে পারেন।বেসরকারিভাবেও এরকম বিভিন্ন সংস্থায় মানসিক স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে অবশ্যই রেজিস্টার্ড সাইকোলজিস্ট অথবা সাইকিয়াট্রিস্ট ছাড়া অন্য কারও পরামর্শ নেওয়ার চেষ্টা করুন। নিজে থেকে কোনো ঔষধ সেবন করা থেকে বিরত থাকুন।
শারীরিক যত্ন
শারীরিক সুস্থতা নির্ভর করে গর্ভপাতের পদ্ধতি এবং গর্ভাবস্থার সময়কালের উপর।বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, শরীর তুলনামূলকভাবে দ্রুত পুনরুদ্ধার লাভ করে।
জ্বর বা ঠাণ্ডা লাগা: মিসোপ্রোস্টোল (Misoprostol) সেবনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হালকা জ্বর বা ঠাণ্ডা লাগা স্বাভাবিক। তবে ২৪ ঘণ্টার বেশি জ্বর থাকলে অবিলম্বে ডাক্তারের সাথে কথা বলা উচিত, কারণ এটি সংক্রমণের লক্ষণ হতে পারে।
সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে নিম্নলিখিত নির্দেশাবলী মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ:
এই সময়ে স্নান করার বদলে শাওয়ার (showering) ব্যবহার করুন এবং সুইমিং পুল এড়িয়ে চলুন।
গর্ভপাতের পর পরই সহবাস করলে যোনিপথে ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই গর্ভপাতের সব লক্ষণ পুরোপুরি সেরে যাওয়ার পরে সহবাস করলে ভালো হয়। এজন্য গর্ভপাতের পর প্রায় ২ সপ্তাহ সহবাস এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ২ সপ্তাহ পর্যন্ত ট্যামপুন বা মিন্সট্রুয়াল কাপ ব্যবহার না করলে ভালো হয়। কেননা এই সময়ে এসব ব্যবহার ইনফেকশনে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।গর্ভপাতের ২ সপ্তাহ পরেই পুনরায় গর্ভধারণ করা সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি গবেষণায় বলা হয়েছে যে, গর্ভপাতের কমপক্ষে ৬ মাস পর পুনরায় গর্ভধারণ করলে তা মা ও শিশুর জন্য ভালো ফলাফল নিয়ে আসতে পারে।তবে অপরদিকে স্কটল্যান্ডের নারীদের ওপর একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, প্রথমবার গর্ভপাতের ৬ মাসের মধ্যে গর্ভধারণ করলে ভালো ফলাফল পাওয়া যেতে পারে।তাই আপনার শারীরিক অবস্থা এবং পূর্বের গর্ভধারণের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে ডাক্তার আপনাকে পুনরায় কখন গর্ভধারণ করলে ভালো হয় সে বিষয়ে আরও ভালো পরামর্শ দিতে পারবেন। সেজন্য হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার সময়ে অথবা পুনরায় গর্ভধারণ করার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়ার চেষ্টা করুন।
এসময়টায় আপনি গর্ভবতী হতে না চাইলে গর্ভপাতের পর যত দ্রুত সম্ভব যেকোনো ধরনের কার্যকর জন্ম-নিরোধক ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করে দিতে হবে।
তবে গর্ভপাতের পর ১ বার মাসিক হয়ে যাওয়ার পর গর্ভধারণের চেষ্টা করলে ভালো হয়। এতে করে আপনি কখন গর্ভধারণ করেছেন তা বুঝতে সুবিধা হয়। সাধারণত গর্ভপাতের ৪-৮ সপ্তাহের মধ্যে মাসিক শুরু হয়ে যায়। তবে একেক জনের ক্ষেত্রে এই সময়কাল কম-বেশি হতে পারে। তবে শুরুর দিকে মাসিক অনিয়মিত হতে পারে এবং মাসিক চক্র স্বাভাবিক হতে বেশ কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে।
অনেকক্ষেত্রে গর্ভপাতের কোনো নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে তা সবসময় প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় না। তবে গর্ভপাতের ঝুঁকি কমানোর জন্য আপনি যেসব বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে পারেন—
গর্ভধারণ করার আগে প্রি-কন্সেপশন চেকআপে আপনার ডাক্তারের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করুন। এই চেকআপে আপনি পূর্বে গর্ভবতী হয়ে থাকলে সে সম্পর্কে এবং আপনার ও আপনার সঙ্গীর পরিবারের কোনো বিশেষ রোগের ইতিহাস আছে কি না সে সম্পর্কে কিছু তথ্য সংগ্রহ করা হবে।পাশাপাশি আপনি বর্তমানে কোনো ঔষধ সেবন করছেন কি না এবং কোনো রোগে আক্রান্ত আছেন কি না সেসব তথ্যও নেওয়া হয়। আপনি গর্ভবতী হওয়ার জন্য শারীরিকভাবে সুস্থ কি না সেটি যাচাইয়ের জন্য কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। যেমন: রক্ত পরীক্ষা, প্রস্রাব পরীক্ষা, ওজন মাপা, রক্তচাপ মাপা এবং প্রয়োজনে জরায়ুমুখের অংশ সংগ্রহ করা (প্যাপ টেস্ট)। এর পাশাপাশি চিকিৎসক কর্তৃক আপনার পেট, তলপেট ও স্তনের শারীরিক পরীক্ষা করা হতে পারে।এসবের মাধ্যমে আপনার কোনো শারীরিক সমস্যা থাকলে তা নির্ণয় করে সে অনুযায়ী চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়।
গর্ভকালীন সময়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টিকর ও সুষম খাবার খান। পাশাপাশি দিনে কমপক্ষে পাঁচ পরিবেশন ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়ার চেষ্টা করুন। পাশাপাশি গর্ভধারণের পরিকল্পনা করার সময় থেকে আপনি ফলিক এসিড ও আয়রন ট্যাবলেট খেতে পারেন। এর ফলে গর্ভে সন্তানের বেড়ে ওঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই উপাদানগুলোর কোনো ঘাটতি থাকবে না।
গর্ভধারণের আগে শরীরের ওজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মাত্রায় নিয়ে আসুন। কেননা অস্বাভাবিক বেশি ওজন গর্ভপাতের আশংকা বাড়িয়ে দিতে পারে। খাদ্যাভ্যাস ও দৈনন্দিন জীবনে সক্রিয় থাকার মাধ্যমে আপনি আপনার ওজন স্বাভাবিক সীমার মধ্যে রাখতে পারেন।
মানসিক চাপ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করুন। অতিরিক্ত চাপ গর্ভধারণের সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে। নিজেকে মানসিকভাবে সুস্থ-সাবলীল রাখার জন্য শারীরিক ব্যায়াম, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম কিংবা মেডিটেশনের সাহায্য নিতে পারেন।
ক্যাফেইনযুক্ত খাবার, অর্থাৎ চা-কফি পরিমিত পরিমাণে পান করুন। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করলে (দিনে আনুমানিক দুই কাপের বেশি) তা গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
ধূমপান, মদ্যপান অথবা অন্য কোনো নেশা জাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করে থাকলে তা সম্পূর্ণভাবে বাদ দিন। এই সকল দ্রব্য নারী-পুরুষ উভয়ের প্রজনন ক্ষমতাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।তাই আপনি ও আপনার সঙ্গী দুইজনই ধূমপান, মদ ও নেশা দ্রব্য পুরোপুরি এড়িয়ে চলুন।
গর্ভাবস্থায় গর্ভের শিশুর ক্ষতি হতে পারে এমন কোনো বিশেষ ধরনের ইনফেকশন থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে সতর্ক থাকুন। যেমন: রুবেলা। গর্ভাবস্থায় কাঁচা অথবা অর্ধসেদ্ধ মাছ, মাংস, ডিম ও দুধ খেলে শরীরে নানান জীবাণু প্রবেশ করার ফলে আপনি ও আপনার গর্ভের শিশু ইনফেকশনে আক্রান্ত হতে পারেন। তাই এসময়ে মাছ, মাংস, ডিম ও দুধ ভালোভাবে সেদ্ধ করে খাবেন।
জরুরি অবস্থা
নিম্নলিখিত লক্ষণগুলির মধ্যে যেকোনো একটি দেখা গেলে অবিলম্বে আপনার ডাক্তারকে কল করুন:
শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
এই তথ্যগুলি শুধুমাত্র সাধারণ নির্দেশিকা। আপনার ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য এবং সুস্থতার জন্য সবসময় আপনার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী বা ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।